ইচ্ছেপূরণ I শুভ চন্দ্র দাস


চলতি পথে হঠাৎ দেখা । ভাবিনি দেখা হবে কখনো। কিন্তু মনে একটা আশা পুষে রেখেছিলাম সবসময়, আবার আমাদের এক দিন দেখা হবে, শেষ কথা হলেও হবে।
দু’মাস আগে সরকারী আদেশে কক্সবাজার শহরে বদলী হলাম। সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ২ টা পর্যন্ত রোগী দেখি। মাঝে মাঝে রোহিঙ্গা দের নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করি। মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়। কিন্তু এসবই এক মাস এর জন্য।  এরপর আবার আগের মত উদাসীন হয়ে যাই। কিন্তু মনে মনে ক্ষীণতম আশা ছিল দেবযানীর সাথে আমার দেখা হবে। এ শহর  দেবযানীর শহর।
রোজ বিকেলে সমুদ্র দেখতে যেতাম, রোগীদের অপেক্ষমান ভীড়ে আমার চোখ প্রিয় একটা মুখের খোঁজ করত। আচ্ছা? দেবযানীর কি অসুখ হয় না? ও কি সমুদ্র দেখতে আসে না? তাহলে তাকে দেখতে পেতাম।  সবসময় একটা নেই নেই ভাব পেয়ে বসেছিল আমায়।
এরপর হঠাৎ এক সন্ধ্যার পর তার দেখা। এক রোগী দেখে ফিরছিলাম। মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আর মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন আর বিজলী আসন্ন দুর্যোগের ভাল করেই আভাস দিচ্ছিল। হঠাৎ দেখি বট গাছের নিচে কেউ এক জন দাঁড়িয়ে লিফট চাচ্ছে। কাছে গিয়ে হৃদ স্পন্দন থেমে যায়। এ আর কেউ না, এ আমার কৈশোরের দেবযানী।
দেবযানীর সাথে পরিচয় যখন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই। তার বাবা ছিল অনেক বড় ব্যাবসায়ী। বাবা মায়ের একমাত্র কণ্যা হিসেবে খুব আদুরে ছিল । তার পৈত্রিক নিবাস কক্সবাজার হলেও তার বাবার ব্যাবসায় খাতিরে তখন লক্ষ্মীপুরেই থাকত।
একেবারে গ্রাম থেকে যেসব ছেলেরা উঠে আসে, শহরে এসে তারা প্রথমে খাপ খায় না। শহুরে আচার আচরণ শেখা লাগে, কায়দা কানুন জানা লাগে। তার উপর শৈশবে বাবা মারা যায়। বিধবা মা অনেক কষ্টে মানুষ করছে। জেলা শহরে যখন ভর্তি হলাম সেই অর্থে আমার কোন বন্ধু ছিল না।  এক দিকে পারিবারিক অর্থনৈতিক দৈন্যদশা,অন্যদিকে শহুরে বন্ধুহীন পরিবেশে আমার কিছু করার ছিল না। তাই সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান পড়াশুনার মধ্যেই দিয়েছিলাম। তার ফল এক বছর বাদের পেলাম। ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্রদের মধ্যে চলে আসলাম।
এক সময় ক্লাস নাইনে উঠলাম। দুনিয়া সম্পর্কে অনেক জ্ঞান লাভ করেছি ইতিমধ্যে। আর শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করেছি সবেমাত্র। দুনিয়াটা সব নতুন আর রঙ্গিন লাগছিল সেই সময়টাতে।
বলাবাহুল্য, তখন ক্লাসের সব ছেলেদের প্রধান আকর্ষণ ছিল দেবযানী। আড়ালে ছেলেরা তাকে নিয়ে কথা বলত। আমার ও ওকে ভাল লাগতে শুরু করেছিল। কিন্তু আমি তাদের সাথে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারতাম না। কোথায় যেন একটা বাঁধা পেতাম। ছেলেরা যখন তাকে নিয়ে হাস্যরস করত তখন খারাপ ই লাগত।
বস্তুত, অনেক ছেলে তার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত, সে যখন বেনী দুলিয়ে হাঁটত তখন অনেক বেয়াড়া ছেলে মুখে শিস দিত। এ সবই দেবযানী বুঝত।
বলে রাখা ভাল, ওর বাড়ির রাস্তা আর আমার মেসের রাস্তা একই দিকে। প্রায়ই যে তার সাথে আমার রাস্তায় দেখা হত না, তা নয়। ওকে দেখলে কেন জানি হৃদকম্পন বেড়ে যেত, গলা শুকিয়ে যেত। তারপর ও চাইতাম ওর সাথে আমার দেখা হোক। তার সাথে যেন দেখা হয় তাই সময় মিলিয়ে বেড় হতাম, কিন্তু কখনও কথা বলার সাহস পেতাম না। হয়ত গ্রামের ছেলে বলে সাহস ছিল না, হয়ত গরিব বিধবা মায়ের ছেলে বলে একট পিছুটান ছিল।
এক দিন স্কুল থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক আসল।“শুভ, দাঁড়াও’’। এ ডাক আমার চেনা। ক্লাসে অনেক বারই শুনেছি। এ গলা দেবযানীর।  কেউ যে আমায় বিশেষ করে দেবযানী আমাকে প্রথম বারেই নাম ধরে ডাকবে তা কখনো চিন্তা করি নি আমি। আমি হলে পারতাম না। “তুমি এত ভাব  নাও কেন? আমরা তো একই ক্লাসে পড়ি’’।
কৈ না তো? আমি ভাব নেই না। আমি এরকম ই। বললাম আমি। কথা গুলো কেমন যেন গলায় জড়িয়ে গেল।
জানো, তুমি ছাড়া ক্লাসের,এ পাড়ার সব গুলো ছেলে বদ! তুমি কি আমার বন্ধু হবে?
হতচকিয়ে গেলাম আমি। যাকে দেখার জন্য সময় মিলিয়ে বের  হতাম, যে ছিল সকল ছেলের আরাধ্য, সে আমার বন্ধু হতে চায়। কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠলাম!
সেই থেকে শুরু। রোজ সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তার বাসার সামনে  দাঁড়িয়ে থেকে তাকে নিয়ে স্কুলে যেতাম, স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে এক সাথে খেতাম।  অন্য ছেলেরা আমার সৌভাগ্যে ঈর্ষা বোধ করত, কিন্তু কিছু বলতে পারত না। আর আমিও এসব উপভোগ করতাম।
স্কুল জীবন শেষ করে কলেজে একই সাথে ভর্তি হলাম। স্কুল থেকে কলেজের পরিবেশ ছিল আরো মুক্ত। আমি তাকে আমার স্বপ্নের কথা বলতাম। ডাক্তার হয়ে মায়ের ইচ্ছা পূর্ণ করতে চাই। ওর স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে ও খিল খিল করে হাসত, আর বলত, ধুর! আমার কোন স্বপ্নটপ্ন নেই। আমি ভাল গৃহিনী হতে চাই, আর এ ডজন বাচ্চা চাই ।ওরা আমাকে সারাক্ষণ মা মা বলে ডাকবে।
দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ হয়ে গেল। এই সাত বছরে ওকে আমি ভালবেসে ফেললাম। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলতে পারিনি। হয়ত গরিব ছিলাম বলে, হয়ত দেবযানী অনেক ধনী ঘরের মেয়ে বলে। হয়ত সে ও বুঝতে পেরেছে বা বুঝেনি। আমি ওর মন বুঝতে পারতাম না।

ফাইনাল পরীক্ষার পর হঠাৎই দেবযানীর বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। তার ঠাকুমা মরমর। নাতনি জামাই দেখতে চান। চোখ ফেটে জল এল। কিন্তু কিছু করাই ছিল না। মায়ের স্বপ্ন সফল করতে হবে। দিনরাত শুধু পড়ে চলেছি। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে ওর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের আগের আমার সাথে দেখা করে হাত ধরে অনেক কান্না করে ছিল। আমি ওর কান্নার কারণ বুঝতে পারিনি।
মনে এক বিষাদ জমে ছিল। আর পড়তে পারিনি । তারপরও সরকারী মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু ভর্তির টাকা ছিল না আমার কাছে। এক দিন হঠাৎ আমার মেসে এসে ভর্তির টাকা দিয়ে যায় আমাকে। আমি নির্লজ্জ্বের  মত টাকাটা নেই। সেই শেষ দেখা।
সেই দেবযানীকে আজ দেখলাম। চৌদ্দ বছর পর।
দেবযানীকে তার বাসায় পৌঁছে দিলাম। প্রবল ঝড় হচ্ছে। ৭ নাম্বার বিপদ সঙ্কেত চলছিল। গাছ ভেঙ্গে রাস্তায় পরেছিল, রাস্তায় জল জমে গিয়েছে। ফেরার সব রাস্তা বন্ধ। দেবযানী থেকে যেতে বলেছিল। অগত্যা থেকে গেলাম।
ভেজা শাড়ী বদলে এল দেবযানী। ভেজা চুলে তাকে অপূর্ব লাগছিল। এখনো অনেক সুন্দর রয়ে গেছে সে।  বুকের বাম পাশে কেমন চিনচিনে ব্যাথা করছিল।
খেতে খেতে তার কথা শুনলাম। তার ব্যবসায়ী স্বামী ছিল হঠাৎ ধনে ধনী। শিক্ষা আর রুচির বালাই ছিল না। প্রায়ই গণিকা বাড়ি যেত। বাঁধা দিলে তাকে ধরে মারত। বৈবাহিক জীবনে সুখী ছিল না । প্রবল নির্যাতনে তার গর্ভের সন্তান মরে যায়। শেষে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। এর মধ্যে ওর বাবা-মা দুজনেই গত হন। এখন একলা বাড়িতে থাকে সে। ওর চোখ ছলছল করছিল।
মেডিকেল পাস করে ভেবেছি বিয়ে করব না। কিন্তু মায়ের মুখ  পানে চেয়ে বিয়ে করেছিলাম। নতুবা আজ……।  ভাবনা দূর করতে পারছিলাম না।
এর পর পূজা পার্বনে বা সে বিশেষ প্রয়োজনে কল দিলে যেতাম। ধীরে ধীরে সেই সময়ের কথা গুলো প্রবল ভাবে মনে পরে যেতে থাকে। আর বুকে টনটন করতে থাকে।
হঠাৎ একদিন জরুরী ফোন পেয়ে ছুটে যাই। গিয়ে দেখী অজ্ঞান হয়ে পরে আছে মেঝেতে। বুক থেকে কাপড় সরে আছে। উদ্দাম বুক ধীরে ধীরে উঠছে আর নামছে। চোখ সরিয়ে নিলাম পরক্ষণেই। তার নরম উষ্ণ দেহ কোলে তুলে নিলাম। বিছানায় শুইয়ে দিলাম। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস বুকে এসে লাগল। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম গায়ে অনেক জ্বর।
পুরো বাড়িতে শুধু আর আমার শৈশবের দেবযানী। আজ আমি ছাড়া ওর কেউ নেই । ব্যাগ থেকে ইঞ্জেকশন নিয়ে ইঞ্জেকশন দিলাম। মাথায় জল ঢেলে তার শিওরে বসে ছিলাম। রাত দশতায় জ্বর কিছুটা কমলেও রাত তিনটায় আবার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল।  আর তাকে রাখা যাচ্ছিল না। আরেক টা ইঞ্জেকশন দিয়ে  তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম তার পাশে, আমার শরীর থেকে তাকে তাপ দিলাম। কেমন একটা শিহরণ অনুভব করছিলাম।
কখন ঘুমিয়ে পরলাম মনে নেই। সকাল ১০টায় দেখি দেবযানী জ্বর গায়ে চা নিয়ে এসেছে।  মনে মনে লজ্জ্বা পাচ্ছিলাম রাতের কথা ভেবে। তার কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখলাম। জ্বর এখন অনেক কম। হঠাৎ আমার হাত তার বুকের কাছে শক্ত করে ধরে বলল, ‘শুভ! তুমি কি আমাকে একটি সন্তান দেবে? আমি তোমার সন্তানের মা হতে চাই। আমি মা ডাক শুনতে চাই’’।  তখন বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা আমার পক্ষে ছিল না। পরক্ষণে এক পল্লবিত ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়ার স্পর্শ পেলাম আমার ঠোঁটে ।

Shuvo Chandra Das,
SUST, Sylhet

মন্তব্যসমূহ